মুক্তধারা (২০১২) – ষোলআনা সিনেমা সমালোচনা

0
1514

(Muktadhara is a Bengali film released on August 3, 2012. It stars Rituparna Sengupta, Nigel Akkara and Bratya Basu among others)

Nigel

চোখের জলে যে এত আনন্দ লুকিয়ে থাকতে পারে, কে জানতো? মুক্তধারা দেখতে দেখতে দর্শকদের চোখ ঝাপসা হয়ে আসাটাই স্বাভাবিক – কিন্তু সবটুকুই শান্তির – যেন সত্যিই ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও’। শ্রাবণের ধারার মত ছবি এই মুক্তধারা। কিছু সিনেমা সত্যিই এমনও হয়, যেগুলি দেখার পরে সেগুলোকে ভাল-মন্দ’র সীমানা বা গন্ডির মধ্যে বেঁধে রাখতে মন চায় না – কারণ সেগুলি হয় সমস্ত জাগতিক বিশেষণের বহু, বহু ঊর্ধে। হিন্দী ছবি Taare Zameen Par ছিল এরকমই একটি ছবি। বাংলাতে এমনই একটা সিনেমা ছিল ‘ইছ্ছে’। সবাইকে মুগ্ধ করে দিয়ে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের নবতম প্রচেষ্টা ‘মুক্তধারা’-রও সেই গোত্রে উত্তরণ ঘটল। এরকম একটা অসাধারণ সিনেমার সমালোচনা লিখতে বসে ভাষা যেন হারিয়ে যায়, এলোমেলো হয়ে যায় সব শব্দ। কি লেখা যায়? কি লেখা উচিত? কেমন করে ধরা যায় সেই অভিজ্ঞতা, যা সকল দর্শককে মুগ্ধ করে? ছবিটি দেখতে দেখতে শ্রাবণের ধারার মত সিনেমাপ্রমীদের চোখ থেকে ঝরে পড়তে পারে কিছু মুক্তধারা – যে ধারার কিছুটা অন্ততঃ অনুভূত হবেই।

Nigel and Rituparna

দেবশঙ্কর হালদার অভিনীত আই.জি. ব্রিজনারায়ণ দত্তের চরিত্রটি দর্শকদের মনে পড়িয়ে দিতে পারে জরাসন্ধের কথা। ব্রাত্য বসু-অভিনীত অ্যডভোকেট অরিন্দমের ভূমিকাটি আপাতদৃষ্টিতে খলনায়কোচিত হলেও মাঝে মাঝে মন দিয়ে তাঁর বক্তব্য শুনতে বাধ্য হবেন দর্শকরা, কারণ তাঁর বলা কথাগুলোর মধ্যে যথেষ্ট চিন্তার বিষয় রয়েছে। লক্ষণ পান্ডা-রূপী খরাজ বন্দ্যোপাধ্যায় অনেকদিন পর খেলো রসিকতার ঊর্ধে উঠে একটি ভিন্নধর্মী চরিত্রে দারুণ অভিনয় করে চমকে দিলেন। পরিচালক শিবপ্রসাদ হ্যাপি সিং-এর ভূমিকায় অনবদ্য। ছোট কয়েকটি চরিত্রে বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, সুমিত সমাদ্দার, রজত গঙ্গোপাধ্যায়, অরুণ মুখোপাধ্যায় ও অলকানন্দা রায় বেশ ভালো। শিশুশিল্পী সুচিত্রা চক্রবর্তী বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে। মেয়েটি সবাইকে চমকে দিয়েছে তার অব্যক্ত অভিব্যক্তির দ্বারা। শিবু ও নন্দিতা চরিত্র নির্বাচনে অসামান্য মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন।

মুক্তধারার গল্প নিয়ে তেমন করে নতুন কিছু লেখার নেই, কারণ এতদিনে প্রচার মাধ্যমের ভূমিকায় বোধহয় সবাই তা জেনে গেছেন। তাও ছোট করে একবার গল্পটার ওপর চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক:

জেল বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল ব্রিজ নারায়ণ দত্ত (দেবশঙ্কর হালদার) চান রাজ্যের প্রধান সংশোধনাগারে আসুক মুক্তধারা। সেই স্বপ্ন নিয়ে তিনি দ্বারস্থ হন নৃত্যশিল্পী নীহারিকা চট্টোপাধ্যায় (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)-র, যিনি বিখ্যাত আইনজীবি অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় (ব্রাত্য বসু)-র স্ত্রী। স্বামীর একপ্রকার অমতেই নীহারিকা নিজের কাঁধে তুলে নেয় এক অসম্ভব গুরুদায়িত্ব। তিনি সংশোধনাগারের আবাসিকদের নিয়ে উপস্থাপনা করতে চান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাল্মীকি প্রতিভা। নীহারিকা বাল্মীকির চরিত্রে নির্বাচন করেন কুখ্যাত অপরাধী ইউসুফ মহম্মদ (নাইজেল আক্কারা)-কে, যার নামে পুলিশের খাতায় লেখা আছে ১৩টি খুন ও ৭টি অপহরণের মামলা! এমনই এক অপরাধীকে নির্বাচন করে নীহারিকা দস্যু রত্নাকর তথা বাল্মীকির চরিত্রে। প্রথমে রাজি না হলেও ইউসুফ পরে নাচতে ও অভিনয় করতে রাজি হয়ে যায় বাল্মীকির ভূমিকায়। কিন্তু তার মনটা পুরোপুরি তখনও বাল্মীকিসুলভ হয়ে উঠতে পারেনি। নাটকের রিহার্সালের পাশাপাশি ইউসুফ ফন্দি আঁটতে থাকে, কিভাবে অনুষ্ঠানের দিনেই জেল ভেঙে পালাবে। তারপর? শেষপর্যন্ত কি হল তা জানতে গেলে সবাইকে দেখতে হবে মুক্তধারা।

সত্যিই কি দস্যু রত্নাকররা কখনও বাল্মীকি হয়ে উঠতে পারে? এই জটিল মনস্তাত্বিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন পরিচালকদ্বয় শিবপ্রসাদ ও নন্দিতা। নীহারিকার ভূমিকায় ঋতুপর্ণা পারমিতার একদিন ও আলো-র পর তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয়টি করে ফেললেন মুক্তধারায়। মুক্ত বারি ধারার মত তিনি ঝরে পড়লেন প্রত্যেকটি দর্শকদের মনে। মনকে সিক্ত করে তুলে, ঢেলে দিলেন এক অনাবিল আনন্দ। মুক্তধারার পাশে ঋতুপর্ণার চারুলতা ২০১১-ও যেন ম্লান। নাইজেল আক্কারার মত একজন বলিষ্ঠ অভিনেতাকে তো বাংলা সিনেমাজগত অনেকদিন ধরে খুঁজছিল। ধন্যবাদ নাইজেলকে, কারণ তিনি এসে টলিউডের অনেক সমস্যার সমাধান করে দিলেন।

সঙ্গীত পরিচালকদ্বয় সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায় (ভূমি) ও জয় সরকার এককথায় অনন্যসাধারণ। বিশেষতঃ জয় যেভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে মিশিয়ে দিয়েছেন ছবির মূল ভাবনার সঙ্গে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। নন্দিতা রায়ের চিত্রনাট্য অসাধারণ। শিবপ্রসাদের লেখা সংলাপ ইউসুফ, নীহারিকা, ব্রিজনারায়ণ, অরিন্দম – সব চরিত্রগুলোকেই আরো জীবন্ত করে তোলে। ভালবাসতে ইছ্ছে করে সবকটি চরিত্রকেই। শুধুমাত্র ইউসুফকে নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না বাল্মীকির রূপান্তর – ছবির শেষে লক্ষণ পান্ডা, অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় – সবাই হয়ে ওঠেন রত্নাকর থেকে বাল্মীকি। সম্পাদক মলয় লাহা বোধহয় আরেকটু কৃপণ হলে পারতেন – কিন্তু এটা দৃশ্যতই স্পষ্ট যে এই ছবির সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, সবাই একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। তাই হয়তো এইসব ছোটখাটো ব্যাপার মাথায় আসেনি – এবং এই না আসাটা যথেষ্ট স্বাভাবিক। চিত্র নির্দেশক অনুপ ঘোষ ও প্রোডাকশন ডিজাইনার নিজেদের বিভাগে অতি উত্তম।

চিত্রগ্রাহক অনিল সিং সম্ভবতঃ আরেকটু উন্নতমানের কাজ করতে পারতেন – কারণ তাঁর সামনে সুযোগ ছিল প্রচুর। সেইদিক থেকে বিচার করলে এই ছবির চিত্রগ্রহণকে সাধারণের পর্যায়েই ফেলা যায়।

কিন্তু এর পরেও মুক্তধারা-র থেকে এক নম্বরও কাটা সম্ভব নয় – কারণ অন্যান্য সব বিভাগে সিনেমাটি অনুপম, অতুলনীয়, অসাধারণ।

ষোলআনার মতে: মুক্তধারা – ১৬ আনা

(Review by: Sanjib Banerji)

LEAVE A REPLY

Please enter your name here
Please enter your comment!