সিনেমা সমালোচনা: হেমলক্ সোসাইটি (২০১২): সৃজিত-পরম-কোয়েল…অসাধারণ!

0
46

Hemlock Society

সৃজিত মুখার্জীর ছবিকে ঘিরে দর্শকদের মনে একধরণের আশা জেগে ওঠে, আর একজন পরিচালকের কাছে সেটা কতটা চাপের হতে পারে সেটা সৃজিত নিশ্চয় খুব ভাল ভাবে টের পাছ্ছেন ইতিমধ্যেই। নিন্দুকেরা বলাবলি করে যে সৃজিত বেকন্টেশ ফিল্মস-এর প্রিয় পরিচালক, আর সেই কারণেই আরো অনেক প্রতিভা টলিউডে থাকা সত্তেও তাঁকে নিয়েই বেশি মাতামাতি হয়। একটাই প্রশ্ন করা যায় সেইসব নিন্দুকদের উদ্দেশ্যে: শুধুমাত্র প্রচার কি একজন মানুষকে দর্শকদের মনের অভ্যন্তরে পোঁছে দিতে পারে, যদি না তার নিজস্ব কিছু দেওয়ার থাকে দর্শকদের? সৃজিত-এর হাত ধরে বেকন্টেশ ফিল্মস যে খানিক অন্য ধরণের বাংলা ছবিতে বিনিয়োগ করছে, সেটাই কি আমাদের কাছে কম পাওয়া? তাহলে আবার এই নিয়ে এত কথা কেন?

‘হেমলক্ সোসাইটি’ দর্শকদের হ্রদয়কে একসূত্রে বেঁধে ফেলার একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা। মানুষের জীবন প্রকৃতি বা ঈশ্বর – যারই দান হোক না কেন, এই জীবনে মানসিক চাপগুলোর মুখোমুখি কিন্ত মানুষকেই হতে হয়। আর কখনো কখনো যখন সেই চাপগুলো অতিরিক্ত দুঃসহ হয়ে ওঠে, তখন মানুষের হয়তো মাথায় আসতে পারে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার চিন্তা। কিন্তু এই মনোভাব কি যুক্তিযুক্ত? সত্যিই কি এমন কোন কারণ থাকতে পারে, যার জেরে মানুষ নিজেকে নিজের হাতে পৃথিবী থেকে নিশ্চিন্হ করে ফেলাটা কারণসঙ্গত প্রমাণ করতে পারে? নাকি সবটাই মানুষের স্নায়বিক দুর্বলতা বা মানসিক বিকার? এই জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন সৃজিত তাঁর তৃতীয় ছবির মাধ্যমে। গল্পটা লিখছি না এখানে – কিন্তু বুদ্ধিমান দর্শক ছবির বিজ্ঞাপন দেখেই আন্দাজ করে ফেলতে পারবেন ছবির ধাঁচটি। ‘২২শে শ্রাবণ’-এর মত রহস্যময়তা কিন্তু এ ছবির মধ্যে নেই।

প্রথমেই পাঠকদের বলে রাখা যাক যে ‘হেমলক্ সোসাইটি’-র আসল নায়ক হিসেবে চারজনকে চিহ্নিত করা যায় – চিত্রগ্রাহক সৌমিক হালদার, সম্পাদক বোধাদিত্ব ব্যানার্জী, পর্দার নায়ক পরমব্রত চ্যাটার্জী ও পরিচালক সৃজিত মুখার্জী। এই চারজনের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উজ্জ্বল উপস্থিতি সত্তেও নায়িকা কোয়েল মল্লিক নিজের জায়গাটুকু ধরে রাখতে পেরেছেন সাবলীল ভাবে – তাই তাঁর অভিনয় এ ছবিতে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খুব, খুব ভাল কাজ করেছেন বাংলা বাণিজ্যিক ছবির জনপ্রিয়তম নায়িকা, আর তার মাধ্যমেই সৃজিত ‘মেঘনা বসু’-কে করে তুলেছেন জীবন্ত। আলাদা করে বলতে হবে রূপা গাঙ্গুলীর কথা, কারণ অনেক, অনেক দিন পর বাংলা ছবিতে দর্শকরা ফিরে পাবেন এই দক্ষ অভিনেত্রীকে স্বমহিমায়। দীপন্কর দে যথারীতি নিজের কাজটি দারুণভাবে করে দিয়েছেন। ছোট ছোট চরিত্রে এক গুছ্ছ প্রবীণ অভিনেতা (সব্যসাচী চক্রবর্তী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসু, বরুণ চন্দ এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়) এককথায় অসাধারণ! রাজ চক্রবর্তী, যিনি নিজেও একজন পরিচালক, ছোট্ট একটা চরিত্রে বেশ ভাল। শিলাজিৎ মজুমদার যে সিনেমাগুলিতে কাজ করেছেন, তার মধ্যে এতদিন ‘ছ-এ ছুটি’-ই ছিল শ্রেষ্ঠ। ‘হেমলক্ সোসাইটি’ কিন্তু সেই শিরোপাটাও নিজের করে নিল।

সিনেমাটায় প্রিয়ান্কার অভিনয়ের কথা বিশেষভাবে উল্লিখিত হওয়ার দাবী রাখে। ভেবেও অবাক লাগে যে তাঁর অসাধারণ, স্বতঃসফূর্ত অভিনয়ক্ষমতা এর আগে সেরমভাবে ব্যবহ্রতই হয়নি। সৃজিতের ‘হেমলক্ সোসাইটি’-তে প্রিয়ান্কা যেন এক টুকরো হিরে, যদিও তাঁকে প্রথমবার পর্দায় এনেছিলেন রাজ চক্রবর্তী। সাহেব চ্যাটার্জীর চরিত্রটি একটু যেন বিভ্রান্তিকর, এবং তিনি নিজেও তাঁর চরিত্রর প্রতি তেমন সুবিচার করতে পারেননি। অনিন্দিতা, পামেলা ভূতোরিয়া ঠিকঠাক।

‘হেমলক্ সোসাইটি’ দেখতে দেখতে অনেকেরই মনে পড়ে যেতে পারে ETV-বাংলায় প্রচারিত একটি ধারাবাহিক, ‘মৈনাক উপাখ্যান’-এর কথা। সেখানেই দর্শকরা প্রথমবার দেখতে পায় পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়কে। কিছুটা ভীতু ও লাজুক ধাঁচের সেই পরমকে আবার দেখা যায় অন্জন দত্তের ‘হাফ চকোলেট’ ধারাবাহিকে, ‘নিয়ন’ নামক এক ব্যান্ড-গায়কের ভূমিকায়। তারপর অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে পরমব্রত। সেই পরম আজ ‘২২শে শ্রাবণ’, ‘কহানী’, ভূতের ভবিষ্যৎ’ এবং এখন ‘হেমলক সোসাইটি’-র নায়ক। অসামান্য উত্তরণ ঘটেছে অভিনেতা হিসেবে পরমব্রতর। ‘হেমলক’-এর পরমকে প্রায় নিখুঁতই বলা চলে। সৃজিত-কে ধন্যবাদ দিতেই হবে কোয়েল-পরম জুটিকে এই সিনেমায় একসাথে আনার জন্য।

ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর আবহসঙ্গীত ছবির চিন্তাধারার সাথে বেশ মানানসই। সুরকার ও গীতিকার অনুপম রায়ের প্রত্যকটা গান মনের ভেতর যেন একটা ছাপ রেখে যায়। শ্রেয়া ঘোষালের গলায় ‘এই তো আমি চাই’ শুনতে শুনতে হ্রদয় যেন হারিয়ে যায় কোন সুদূরের পথে। ‘জলফরিং’ গানটিও বেশ ভাল, যদিও সুরটা নচিকেতার ‘পৌলমী’-র থেকে অনেকটাই অনুপ্রাণিত।

কয়েকটা প্রশ্ন কিন্ত রয়েই যায় ‘হেমলক্ সোসাইটি’ সিনেমাটিতে। পরমব্রত আর কোয়েলের মধ্যে রোম্যান্সটা যেন একটু তাড়াহুড়ো করেই দেখানো হয়েছে ছবিতে। নুন, মিষ্টি, মশলা – সবই যেন একটু কম কম – তাই ঠিক জমল না এই প্রেম পর্বটি। কোয়েল হারিয়ে যাওয়ার পর দীপন্কর দে ও রূপা গাঙ্গুলীর আচরণ এবং অভিব্যক্তিগুলোও যেন কেমন সাজানো-সাজানো। ঘুম ভাঙা মাত্র পুলিশ স্টেশনে গিয়ে বসে থাকাটাও দর্শকদের একটু বোকা-বোকা লাগতে পারে। সৃজিত তাঁর নিজের এবং সুদেষ্না রায়ের চরিত্রদুটি সম্পাদিত না করে দিলেই পারতেন – কারণ ‘দয়াল খাসনবীশ’-এর অনুপস্থিতিটা বেশ চোখে পড়ে। পরমব্রত-র চরিত্রটা নিয়েও আরেকটু রহস্যময়তা থাকলেও ভাল হত (যেমনটা ছিল ‘থোড়িসি রুমানি হো যায়’-তে নানা পাটেকরের চরিত্রটিতে)। ‘শান্তনু’ হিসেবে সাহেবের অভিনয়ও আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নয়।

আর বেশি কথা বলার নেই এই অসাধারণ সিনেমাটা নিয়ে। টিকিট কেটে, হলে গিয়ে দেখে আসুন ‘হেমলক্ সোসাইটি’ – সৃজিত মুখার্জীর তৃতীয় ছবিটি আপনাদের বেশ ভালই লাগবে।

(Contributed by: Sanjeeb Banerjee; Image credits: Tollyfanzone.com; Video credits: Musicjagat.com)

LEAVE A REPLY

Please enter your name here
Please enter your comment!