Bangla Movie Review: Meghe Dhaka Taara

1
91

Meghe Dhaka Taara

পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় ছবি “মেঘে ঢাকা তারা”, তার প্রথম ছবি উড়ো চিঠির মত উড়ে যাবে না, দর্শকদের উদ্দেশ্যে এই আশ্বাস দিয়ে এই প্রতিবেদন শুরু করা যাক।

একজন পরিচালকের সঠিক জাত চিনিয়ে দেয় বিষয় নির্বাচনে তার সাহসিকতা ও সেই বিষয়টিকে সিনেমার পর্দায় নিয়ে আসার সক্ষমতা, ঠিক যেমনটা ছিল এই ছবির নায়ক ঋত্বিক কুমার ঘটকের(যদিও এক অজানা কারনে এই ছবির মুল চরিত্রের নাম নীলকান্ত বাগচী)। এই দুই বিভাগেই যথেষ্ট কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়।

একটা কথা জানিয়ে রাখা ভালো যে যারা নিয়মিত থিয়েটার দেখেন না বা থিয়েটারের ভাবনার রশদ খুঁজে পান না, তারা কতটা মেঘে ঢাকা তারা উপভোগ করবেন তা নিয়ে একটু সন্দেহ থেকে যায়।

ঋত্বিক ঘটকের জীবনটাই অতিনাটকীয়, প্রচুর সিনেমার বৈশিষ্ট্যযুক্ত মসালা আছে, আর তাই হয়ত এখানটাতেই সত্যজিৎ রায়কে হারিয়ে দিলেন ঋত্বিক ঘটক। তাকে নিয়ে যে একজন পরিচালক একটি আস্ত ছবি বানিয়ে ফেললেন কারন ঋত্বিক ঘটকের জীবনে নাটকের সমস্ত উপাদানই মজুত আছে। সেই উপাদানগুলিকে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় খানিক সাজিয়ে আমাদের সামনে প্রস্তুত করেছেন। মজাটা হচ্ছে সেই সাজানোটা কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের মতই এলোমেলো। টাইম ফ্রেম নিয়েও অদ্ভুত সব খেলা খেলেছেন পরিচালক। ঘটনাগুলো বিদ্যুৎ চমকের মত এসে ধাক্কা দিয়েছে দর্শকদের মনে, তাই ছবিটি জীবনীমূলক হলেও পরিপূর্ণ একটি ছায়াছবি হয়েছে, তথ্যচিত্র হয়নি।

কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় এই ছবির জন্য যে টিম নির্বাচন করেছিলেন এই টিমের প্রতিটি সদস্যই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সেরা। তাই পরিচালক নিজের কাজটি সাবলীলভাবে করতে পেরেছেন। চিত্রনাট্যকার কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের বড় পর্দায় এটি তৃতীয় কাজ। নটবর নট আউট এবং উড়ো চিঠির থেকে মেঘে ঢাকা তারার চিত্রনাট্য অনেক বেশী শক্তিশালী, বোঝাই যাচ্ছে লেখক এবারে অনেক সতর্ক ছিলেন ঋত্বিক ঘটকের মত একজন ব্যাক্তিত্বকে কেন্দ্র করে ছবি করবেন বলে। তিনি ভেবেছেন অনেক বেশী আর এখানেই ঋত্বিক ঘটকের সার্থকতা, তিনি আমাদের মধ্যে না থেকেও আমাদের ভাবানোর ক্ষমতা রাখেন আজও।

সম্পাদক রবিরঞ্জন মৈত্র অনবদ্য কাজ করেছেন। এলোমেলোভাবে সাজান ঘটনাগুলিকে এক সুত্রে গাঁথার জন্যে প্রয়োজন ছিল একজন অভিজ্ঞ সম্পাদকের আর সম্পাদনায় রবিরঞ্জন মৈত্রের মত অভিজ্ঞতা বাংলা ছবির জগতে খুব কম জনেরই আছে। সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্র এই ছবির এসেন্সটাকে সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন তার সুরের মাধ্যমে। চিত্রগ্রাহক সৌমিক হালদার তো এখন বাংলা ছবির সেরা চিত্রগ্রাহক। একের পর এক পুরস্কার ও প্রশংসা তিনি নিজের যোগ্যতা দিয়ে উপার্জন করেছেন। এখানেও সৌমিক হালদারের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকল।

চমকে দিয়েছেন এই ছবির আর্ট ডিরেক্টর। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল বোধহয় কোন একাডেমীতে বসে নাটক দেখছি। অ্যাবস্ট্রাক্ট, ইনোভেটিভ নানারকম রুপকের ব্যাবহার যেন এক স্বপ্নের জগতে টেনে নিয়ে গেছে দর্শকদের। সেই স্বপ্ন কখনও সুখকর আর কখনও বা ভয়ঙ্কর (যখন ধর্ষিতা সাঁওতালি যুবতি ফুলমতির অচৈতন্য দেহটিকে কোলে নিয়ে প্রতিবাদী নীলকান্ত যখন গর্জে ওঠে সমাজের উদ্দেশ্যে)। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিষ্ফল আক্রোশে চিৎকার করে ওঠেন “শুয়োরের বাচ্চা..”। তার সেই চিৎকার এক দুঃস্বপ্ন হলেও কতটা যে সত্যি কতটা মর্মস্পর্শী সেটা চোখে না দেখলে, কানে না শুনলে শুধু রিভিও পড়ে অনুধাবন করা অসম্ভব। আর্ট ডিরেক্টর তন্ময় চক্রবর্তীকে মুক্তকণ্ঠে বলি সাবাশ। 

অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। তার চেহারার সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের যদিও কোন মিল নেই তবুও এমন দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন তিনি যে দর্শকরা নীলকান্ত চরিত্রটির সঙ্গে একাত্ম বোধ করতে বাধ্য হয়েছেন। নীলকান্তের স্ত্রী দুর্গার ছরিত্রে অনন্যা চ্যাটার্জী আরেকবার প্রমান করে দিলেন যে তার মত অভিনেত্রী বাংলা ছবির জগতে বিরল, তা সে আবহমানের SHEEKHA হোক বা মেঘে ঢাকা তারার দুর্গা। ডাঃ এস. পি মুখার্জির চরিত্রে আবীর চট্টোপাধ্যায় অসাধারণ অভিনয় করেছেন। শুভাশিস মুখোপাধ্যায় অনবদ্য বিজন ভট্টাচার্যের চরিত্রে।

ছবিতে অন্যান্য চরিত্রে যারা অভিনয় করেছেন তারা হলেন

অনিল চ্যাটার্জির চরিত্রে রাহুল ব্যানার্জি

রিশিকেশ মুখার্জির চরিত্রে জয়দীপ মুখার্জি

সলিল চৌধুরীর চরিত্রে অভিজিত গুহ

মৃণাল সেনের চরিত্রে অনিন্দ্য বসু

সুপ্রিয়া দেবীর চরিত্রে মুমতাজ

শোভা সেনের চরিত্রে বিদিপ্তা চক্রবর্তী

এতসব লিখেও পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়কে কয়েকটি প্রশ্ন করতে খুব ইচ্ছে করছে…

ঋত্বিক ঘটকের জীবনী নিয়ে ছবি করে ফেললেন কিন্তু সেখানে সত্যজিৎ রায়ের কোন উল্লেখ রইল না। সমকালীন চিত্রপরিচালক হিসাবে এই দুই সৃজনশীল মানুষ সামাজিক সমস্যাগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন রুপে ব্যাক্ত করেছেন ছবির ভাষায়, ক্যামেরার লেন্স দিয়ে, নিজেদের সেন্স দিয়ে তাই সত্যজিৎ রায়ের এই ছবিতে থাকা প্রয়োজন ছিল, কিন্তু কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় যত্নসহকারে তর্ক এড়িয়ে গেলেন।
কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঋত্বিকের ব্যাক্তিত্ব ও রাজনৈতিক সংঘাতের গল্পটাও পরিষ্কার করে বললেন না পরিচালক, অথেচ একজন রাজনৈতিক নেতা হয়ে ব্রাত্য বসু কিন্তু তার নিজের লেখা নাটক রুদ্ধসংগীতকে এই বিষয়টিকে যথেষ্ট প্রাধান্য দিয়েছেন। মুল নাতকটি দেবব্রত বিশ্বাসের জীবনীভিত্তিক হওয়া সত্ত্বেও। কারন ঋত্বিকের সঙ্গে সি পি আই (এম) –এর বিভাজনটা তৎকালীন সাংস্কৃতিক জগতে ‘আমরা ওরা’-এর জন্ম দেয়। পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় এমন একটি বিষয় বেছে নিলেন তাহলে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়কে উনি সিনেমার পর্দায় আনতে এত দ্বিধা কেন?

ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাস, বিমল রায়, সলিল চৌধুরীর সম্পর্কগুলোকেও তেমন পরিষ্কার করে দেখানো হইনি। কিন্তু পরিচালক ঋত্বিককে ধরতে গেলে মানুষ ঋত্বিককে জানতে গেলে বন্ধু ঋত্বিকেও বুঝতে হবে বইকি। কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় এই দিকটিকেও তেমন গুরুত্ব দেননি। আর তাতে ছবিটির খানিক সৌন্দর্য হানি ঘটেছে বলে আমার মনে হয়েছে।

 

Bangla Movie Review by Sanjib Banerjee

Image Credit: Google Images

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your name here
Please enter your comment!