Tag: bengali-comics

Review of Graphic Novel Chander Pahar; The Classic in its Many Forms

Chander-Pahar-Graphic-Novelকলকাতা বইমেলা ২০১৪, ‘পারুল প্রকাশনী’ থেকে আত্মপ্রকাশ করলো ‘চাঁদের পাহাড়’- একটি গ্রাফিক নভেল। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী রচনাকে যুগপোযুগী চিত্রনাট্য ও ছবিতে সাজিয়ে তুলে ধরলেন যে শিল্পী, তাঁর নাম সপ্তর্ষি দে। পেশায় তিনি একজন আর্ট ডিরেক্টর, কলকাতা তাঁর কর্মক্ষেত্র। বর্তমানে টাইমস অফ ইন্ডিয়া গ্রুপের বাংলা সংবাদপত্র ‘এই সময়’- এ প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর দৈনিক কমিক স্ট্রীপ ‘প-ফ’। ‘চাঁদের পাহাড়’ সপ্তর্ষির প্রথম প্রকাশিত গ্রাফিক নভেল। গোটা ষাটেক পাতার মধ্যে মূল কাহিনীর সারবস্তুকে জায়গা দিতে গিয়ে গল্পের অনেক ডালপালাকেই কাটছাঁট করতে হয়েছে। শ্বাপদসঙ্কুল আফ্রিকায় গ্রামবাংলার ছেলে শঙ্করের দামাল অ্যাড্‌ভেঞ্চারকে রেখায় ও লেখায় পাঠকের দরবারে পেশ করার যে প্রয়াস করেছেন সপ্তর্ষি, তাতে তিনি একশভাগ সফল একথা হয়ত বলা যায় না। গ্রাফিক নভেলটির নিসর্গনির্ভর প্যানেলগুলি যতটা দৃষ্টিনন্দন, চরিত্রসমূহের দেহরেখা অঙ্কন ততটা মুন্সীয়ানার পরিচয় দেয় না। তবুও আলাদা করে বলতেই হয় সপ্তর্ষির রঙ সংক্রান্ত চিন্তাভাবনার কথা। গোটা বইটির বেশিরভাগ ছবি বহুবর্ণে রঞ্জিত হলেও আলভারেজ যেখানে শঙ্করকে পূর্বকথা শোনাচ্ছে, সেই অংশটিতে ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র দুটি রঙ। চলচ্চিত্রে আমরা যেমন অনেকসময় অতীতের দৃশ্যকে সিপিয়া টোনে দেখি, সপ্তর্ষি তাঁর এই সৃষ্টিতে সেই মান্য ধারারই বুদ্ধিদীপ্ত স্বাক্ষর রেখেছেন।

কথাশিল্পী বিভূতিভূষণের কাহিনী অবলম্বনে সপ্তর্ষির এই গ্রাফিক নভেল সচেতন পাঠকের মনে কিছু চিন্তাভাবনার অবসর এনে দেয়। আজ সারা বিশ্বে কমিক্স ইন্ডাস্ট্রীর যে রমরমা বাজার সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা কমিক্সের অবস্থান ঠিক কোন জায়গায়? শ্রী নারায়ণ দেবনাথ, ময়ূখ চৌধুরী, তুষারকান্তি চট্টোপাধ্যায়, শৈল চক্রবর্তীর মত কিংবদন্তীদের উত্তরাধিকারে সমৃদ্ধ বাংলা কমিক্সের জগৎ। নন্টে-ফন্টে, বাঁটুল দি গ্রেট, প্রফেসর ত্রিবেদী, গোয়েন্দা নিশীথ রায়, ডাকু- এই সব চরিত্র আজও বাঙ্গালীর স্মৃতিতে অম্লান। এই সৃষ্টিসম্পদ যেমন বাঙ্গালীর গর্বের ভাণ্ডার, একই সঙ্গে অতীত গৌরবের অদ্যাবধি এই রোমন্থনেই কোথাও উঁকি মারে ভয়াবহ ভবিষ্যতের সিঁদুরে মেঘ। অতীত বিলাসিতার মসনদ থেকে নেমে বর্তমান বাস্তবের দিকে চোখ ফেরালে এই দৃশ্য নজরে আসতে বাধ্য যে বাংলা কমিক্স ইন্ডাস্ট্রী আজ ধুঁকছে অরিজিনাল কন্টেন্ট বা মৌলিক বিষয় তৈরি করতে না পারার ক্ষয়রোগে। সপ্তর্ষির ‘চাঁদের পাহাড়’ কিন্তু তার মেরুদন্ড ধার করেছে চিরকালীন বাংলা সাহিত্য থেকেই। প্রকাশকের কাছে হয়ত এটা পিঠ বাঁচিয়ে খেলা। নব্য ট্রেন্ড অনুযায়ী একটা গ্রাফিক নভেল বানানোও হল আবার বাজার ধরতেও অসুবিধা নেই যেহেতু উপন্যাস হিসেবে ‘চাঁদের পাহাড়’ অনেকদিন ধরেই বইপাড়ায় বেস্টসেলার তালিকার অন্তর্ভূক্ত। সঙ্গে সঙ্গে একই গ্রন্থনির্ভর টলিউডি সংস্করণের ‘দেব’তুল্য সাফল্য তথা ব্যাবসার স্রোতে গা ভাসানোর ইচ্ছাও যে প্রকাশকের মনে নড়েচড়ে ওঠে নি, সে কথাও হলফ করে বলা যায় না।

কেউ কেউ হয়তো বলবেন, এটা তো খারাপ কিছু নয়, চিরায়ত বাংলা সাহিত্য থেকে আজকের প্রজন্ম মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, সেখানে গ্রাফিক নভেলের মাধ্যমে যদি তাদের আগ্রহকে উস্‌কে দেওয়া যায় তো ক্ষতি কী? আসলে অনেক সময় প্রশ্নোত্তরের ঝড়ের ঠেলায় আসল সত্য চাপা পড়ে যায়। একটি ব্র্যান্ড যখন বাজারে প্রতিষ্ঠা খোঁজে তখন সেই প্রতিষ্ঠার জন্য লাভক্ষতির হিসেবের বাইরে গিয়ে, সেই ব্র্যান্ডটির একটি নিজস্ব চরিত্র গড়ে তোলাটা খুব জরুরী। বাংলা কমিক্স ও গ্রাফিক নভেল নামক ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই ব্র্যান্ড, এই ইন্ডাস্ট্রী আজ যদি বাজারের মুখ চেয়ে শুধুই সাহিত্যনির্ভর হয়ে পড়ে তাহলে মৌলিক বিষয় ও ভাবনা নিয়ে কাজের কোনো সম্ভাবনাক্ষেত্রই হয়তো গড়ে উঠবে না। বাংলা কমিক্স ইন্ডাস্ট্রীও স্বাবলম্বনের পথ খুঁজে না পেয়ে আত্মপরিচয়হীনতার কানা গলিতে হারিয়ে যাবে।

Indranil Kanjilal
Indranil-Kanjilal

Professionally a high school teacher, Dr.Indranil Kanjilal has a passion for comics. Not only reading, he loves to explore this medium of visual storytelling by going through the history of comics’ universe. He also has a knack for writing short features. Being a post graduate student of Bengali literature he has completed his Ph.D. on eminent Bengali author Shirshendu Mukhopadhay.