Tag: bengali-short-story

Bengali Short Story ‘Ek Bhikarir Akashmik Mrityu’ by Author Annwesh Mukherjee

এক ভিখারির আকস্মিক মৃত্যু

“দাদা, কি ব্যাপার ? আপ প্ল্যাটফর্মে এত ভিড় কেন ?”

অমরেশদা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আপ প্ল্যাটফর্মের দিকে, আমার প্রশ্নে একটু বিস্মিত হল । “সাইকেলের দোকানে কিছু শুনতে পেলি না ?”

“না, আসলে কাটোয়া লোকাল মিস করলে যে রক্ষে নেই! তাই, যা হোক করে সাইকেল রেখে, হাঁপাতে হাঁপাতে এলাম, দেখছ তো ?”

“ও আচ্ছা, না সেরকম কিছু না, ওই ইদানীং যে ভিখিরিটা আপ প্ল্যাটফর্মে বসে গান গাইত, সে আজ সকালে মারা গেছে। গানের গলাটা তো বেশ ভালো ছিল, তাই হয়ত লোকজন গেছে দেখতে। অবশ্য, শুনলাম মৃত্যুটা নাকি আকস্মিক।”

“অপঘাতে ? রেলে কাটা পড়েছে নাকি ? ও তো হাঁটা-চলা করতে পারত না, তাই না ?”

“হ্যাঁ, প্রতিবন্ধী ছিল, দুটো পা পুরোপুরি অকেজো। একেবারেই অনাহুত অতিথি ছিল, তবে, অপঘাত নয়। খুব ভদ্রভাবেই, তবে একটু আচমকা মারা গেছে।”

এর মধ্যে কাটোয়া লোকাল এসে হাজির হল ডাউন প্ল্যাটফর্মে – ইচ্ছে ছিল সদ্যমৃত বৃদ্ধকে একবার দেখে আসি, সে আর হল না।

এই ট্রেনটার একটা বিশেষত্ব হল, একবার উঠে পরে দাঁড়িয়ে যেতে পারলে হাওড়া পর্যন্ত নিশ্চিন্ত। বেশিরভাগ দিনই এক পায়ে দাঁড়াতে হয়, আজ যদিও দ্বিতীয় পা ব্যবহারের সুযোগ হল। অমরেশদা আগে উঠেছিল, তাই কিছু দূরে দাঁড়াল – অমর, অজয়, মানিক কাউকে দেখতে পেলাম না। আমার বাঁদিকে দাঁড়িয়ে একজন মাঝ-বয়স্ক ব্যাঙ্কের কেরানি। একদম সামনের দুজন মিষ্টির দোকানের কর্মচারী, ডান দিকে একজন স্কুলের পড়ুয়া। আর পিছনে, অর্থাৎ, আমার বৃহৎ ব্যাগের ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে একজন ডাকবিভাগের কর্মী। এদের সবাইকে আমি চিনি, একই শহরের বাসিন্দা, একসঙ্গে যাতায়াত করি। কিন্তু খুব ভালোভাবে চিনি না, কেবল মুখ চেনা, নাম জানিনা। এরা সবাই আমার সঙ্গে একসঙ্গে ফেরে। আমার, অমরেশদার, আর এদের সবার মধ্যে কাকতালীয়-ভাবে একটা সংযোগ-সূত্র আছে – আর তা হল গান! আমরা সবাই গান ভালোবাসি, বিকেলে ফেরার ট্রেনে কোন ভিখিরি গান গাইতে উঠলে তাদের সাহায্য করে থাকি। যদিও, যে ভিখিরিটা আজ গত হয়েছে, তার গান আমরা একটু বেশিই পছন্দ করতাম। প্রতিদিন আপ প্ল্যাটফর্মে ট্রেন থেকে নেমে, ওই ভিখারির কণ্ঠে রবি ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ, নজরুল, কৃষ্ণচন্দ্র দে, হেমন্ত, সতীনাথ ইত্যাদি সবার গান শুনতাম, আর বলাই বাহুল্য, খুব উপভোগ করতাম। অদ্ভুতভাবে, ওই ভিখারির গান বিভিন্ন পেশা, বিভিন্ন মেধা, বিভিন্ন বয়স, বিভিন্ন জাত, বিভিন্ন ধর্মকে অনায়াসে জুড়ে দিত।

এই সেদিনের কথা, আমরা বেশ কয়েকজন ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “লালন গাইতে পার ?” ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ – গাইল মন দিয়ে, তারপর গাইল, ‘খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচাটিতে’ আর ফোকলা দাঁতে হাসতে হাসতে বলল, “দেখলে আমি রবি আর লালন দুই-ই গাইতে পারি, গান দুটো কেমন একরকম বল’ ?”

সেদিন তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলাম, লোকটা কে ? এ কোথা থেকে এলো ? একে তো যে সে লোক মনে হচ্ছে না! একদিন ঠিক করলাম, একটু আগে আগে বাড়ি ফিরব। ইঞ্জিনিয়ারিঙের ফোরথ-ইয়ার এমনিতে সেরকম চাপের হয়না, আর তাছাড়া আমি চাকরি পেয়েও গিয়েছিলাম, সুতরাং মাঝে-মধ্যে ল্যাব স্কিপ করলে কিছু হতোনা। ট্রেন থেকে নেমে দেখি দাদুর বয়সী সেই ভিক্ষুক গাইছে, ‘মহারাজা, তোমারে সেলাম’, আর তারপর, ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’। পরনে একটাই জুতো, আরেকটা পায়ে কিচ্ছু নেই, পাজামাটার একটা বড় অংশ ফাটা, এক মাথা ঝাঁকরা চুল, গায়ে দুর্গন্ধ, সাদা জামাটা চতুর্দিক দিয়ে জোরা -তাপ্পি দেওয়া। বড় দাড়ির ফাঁকে মুচকি হাসি কিন্তু ঠিক বেড়িয়ে আসছে। আর ঘার নেড়ে, চোখ বুজে গান বেড়িয়ে আসছে গলা থেকে। আমি শুধু গান শুনি, বুঝি না সেরকম, তবে সেদিন ওঁর গলার স্বর শুনে মনে হল তা বঙ্গদেশের কালজয়ী সকল কণ্ঠস্বরের এক সমাহার।

ঔৎসুক্যের উপর কাবু পেতে না পেরে, আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বাবা, তুমি কোথা থেকে এসেছ’, তোমার নাম কি ?”

গান শেষ হয়ে গিয়েছিল, একটু জল বেড়িয়েছিল চোখ থেকে, একটা শতচ্ছিন্ন গামছা দিয়ে তা মুছে বলল’, “আমি দূর দেশ থেকে এসেছি, আমার নাম ভোলানাথ, আমি ওনার চেলা, কৈলাসে অনেক দিন কাটিয়েছি। বোকারো, নাসিক, মায়ানমার, টোকিও, ডালাস, ডারবান, হেলসিঙ্কি, কাবুল, দুবাই, মস্কো ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে শেষে এখানে এসেছি।”

আমি হাসবো না কাঁদবো ভেবে পাচ্ছিলাম না, শুধু জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি তো হাঁটতে পারো না, অত সব জায়গায় গেলে কি করে ?”

“পায়ে হেঁটে নয়, তবে হাতে হেঁটে, আর গান গেয়ে গেয়ে! বাপু, গুরুদেব কি বলেছেন মনে নেই ?’পথ আমারে সেই দেখাবে, যে আমারে চায়’ – ‘আমার শেষ পারানির কড়ি কণ্ঠে নিলেম’, সেই শুনে নজরুল বলে দিলেন, ‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগতটাকে’, কিছু বুঝলে ?”

আমি বুঝলাম এ অন্য গ্রহের প্রাণী, এত সহজে ধরে দেওয়ার পাত্র নয়, ফের জিজ্ঞেস করলাম, “গান শিখলে কোথায় ?”

বুড়ো এবার রেগে লাল হয়ে বলল, “আমার পাঁচ পুরুষ গান গাইছে, এক পূর্বপুরুষ বাহাদুর শাহ জাফরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, ওনার গজলে সুর দিতেন, গান আমার ধমনীতে বইছে, এক পয়সা ভিক্ষা নিই না, গান না শুনিয়ে।”

ট্রেন হাওড়া পৌঁছল, ধাক্কাধাক্কিতে কোনোমতে কামরা থেকে বেড়িয়ে ফের অমরেশদাকে ধরলাম, “দাদা, কিভাবে মারা গেছে বললে না তো ?”

“শুনলাম, গত তিন দিন ধরে আর বুড়ো গান গাইতে পারছিল না। পেটের জ্বালা তো আর মেটে না! তাও চুপ করে বসেছিল, কারুর থেকে এক পয়সা নেবে না গোঁ ধরে বসেছিল। এর মধ্যে আজ সকালে আপে দূর-পাল্লার এক ট্রেন এসে থামে। একজন ঝকঝকে ছোকরা কল থেকে জল নিতে আসে। কলের কাছেই বুড়ো বসে ছিল, নড়াচড়া করতে পারছিল না। ছেলেটি নাকি গালাগাল দিয়ে বুড়োকে বলে, ‘খটখটে চেহারা   নিয়ে ভিক্ষা করছে, ভগবান দুটো পা নিয়ে নিক, দুটো হাত তো দিয়েছে, অন্তত কিছু কাজ করে তো খেতে পারে!’ এ কথা যে বলা হয়েছে তা আশুর চায়ের দোকানের বনমালী নাকি কনফার্ম করেছে। এখন এই কথা শুনে বুড়ো নাকি হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগে, জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। কয়েকজন প্ল্যাটফর্মের লোক হাসপাতালে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে, কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ!”

বুড়ো কাঁদতে কাঁদতে মরে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমি এবং আমার ট্রেনের বাকি প্রতিবেশীরা, যাদের কথা আগেই বলেছি, সবাই অন্তত এক ফোঁটা কেঁদে নিলো অমরেশদার কথা শুনে – কেউ ভিতর থেকে, কেউ বাইরে দিয়ে। এ কান্না সেই বৃদ্ধের গলার স্বরের জেরে, না তার মৃত্যুর দুঃখে, না তার শিল্পীমনের ওপর হানার দরুন, না এক নির্মল প্রতিভার মৃত্যুর অবসাদে, না এক অদ্ভুত কৃত্রিম সমাজের ক্রূরতার দাপটে, না এক অস্থির সমাজের চোখে গুনির অমর্যাদার কারণে, তা আর সেদিন আমাদের মধ্যে কেউই বুঝে উঠতে পারল না ।।

The Author Annwesh Mukherjee

Anwesh Mukherjee

Mr. Annwesh Mukherjee who is a software engineer by profession and is a Swedish National is also a story-writer, a poet and an essayist, who thrives on human values and human emotions, and who embodies in his works, elements from past and present generations of human society. A formidable grip on characters allows him to document complexity and openness with equal ease. The poetic charm gets mixed with a narrative flavor which creates a unique description of incidents in Anwesh’s works. A mind molded in the realm of simplicity of yester-years yearning to reach out to the audacious vivacity of the new age life is a simple depiction of Mr. Mukherjee as an author and a smooth and lucid blend of lyrical words with some commonplace expressions best describes the language the Anwesh the author cherishes the most.

 

Image Credits: Google Images

 

 

Bengali Short Story by Swedish National Mr. Annwesh Mukherjee; ‘Sakkhat O Kichu Prapti’

সাক্ষাৎ ও কিছু প্রাপ্তি

ট্যাক্সি থেকে নেমে, চার পা হেঁটে একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। ঠিক বুঝতে পারছিনা  কিভাবে   কাজটা শুরু   করব।  দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে এত বড় চ্যালেঞ্জের   মুখে কখনো  পড়েছি বলে মনে পরে না।

বেলা বারোটার গনগনে রোদ, হাতে এডিটর সাহেবের লেখা একটা চিঠি, চোখের সামনে একটা মস্ত অ্যাপার্টমেন্টের মুল দরজা, আর দরজার ওপারে দশ তলা উপরে একটা দু কামরার  ফ্ল্যাটে  বিরাজমান    বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ শ্রীযুক্ত সূর্য মুখোপাধ্যায়।

উনি এবছর সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পাচ্ছেন, তাই কাগজের মালিকের  অনুরোধ   আমি   যেন  কাল-বিলম্ব না করে ওনার একটা ইন্টারভিউ নিয়ে আসি।

এখন সমস্যাটা হল এই যে সারাজীবন আমি খেলাধুলা নিয়ে লিখে এসেছি, কেননা প্রথমত, খেলাধুলো আমি চিরকাল ভালবেসে এসেছি, আর দ্বিতীয়ত, আমি জানতাম যে ওসব নিয়ে লিখলে চাকরি আমার  চিরকাল  বজায় থাকবে। কিন্তু নতুন মালিক আমাকে   বিলকুল   পছন্দ   করে না, একটা ছুতো  খুঁজছে কি করে আমাকে তাড়াবে। আর সেই কারণেই এই বাঘের   মুখে ঠেলে দেওয়া।

বুদ্ধির গোরায় শেষ ধোঁয়াটুকু দিয়ে সাহস করে ঢুকে পরলাম  অন্দর মহলে। লিফট ছিল তাই বাঁচোয়া,       পৌঁছলাম ওনার দরজার ঠিক সামনে।

বেল বাজানোর সাথে সাথে আমারই সমবয়সী এক ভদ্রলোক বেড়িয়ে এলেন। হাত জোড়  করে  নমস্কার  করে জানালাম, “আমি ‘খবর বাংলার’ সাংবাদিক, অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুযায়ী   সাক্ষাৎ  করতে  এসেছি   সূর্য-বাবুর  সাথে।”

ভদ্রলোক হাল্কা-স্বরে বললেন, “আমিই সূর্য মুখোপাধ্যায়, আসুন ভিতরে আসুন।”

নিতান্তই ছোট একটা বসবার ঘর – রয়েছে শুধু একটা টিভি, একটা কম্পিউটার টেবিল আর  একটা   বিশাল  বুক-শেল্ফ যার মধ্যে আরামে ঘর করছে কয়েকশো বই। মনে মনে ভাবলাম – ‘আমি  কেন  আমার  তিন  পুরুষ পড়ে শেষ করতে পারবে না।’ অগোছালো ঘরের এক কোনে দুটো সোফা কাউচ রাখা ছিল, তারই একটাতে বসতে বললেন।

“অরিত্র পাঠিয়েছে আপনাকে?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনার মত প্রচার-বিমুখ মানুষকে নিয়ে যে লিখতে পারব ভাবতে পারিনি।”

“তাই বুঝি? হ্যাঁ, কিছুটা ঠিকই বলেছেন, আমাকে এই  অ্যাপার্টমেন্টের লোকই অর্ধেক চেনে  না।”  এই   অবধি বলে উনি বসলেন আরেকটি চেয়ারে। পাশের ঘর থেকে একটি অল্পবয়সী মেয়ে দু কাপ  চা  রেখে  দিয়ে  গেল আমাদের দুজনের সামনের টি টেবিলে।

“প্রথমেই আপনাকে অভিনন্দন জানাই আমার এবং আমাদের কাগজের তরফ থেকে।”

“ধন্যবাদ!”

মানুষটা নিতান্তই মৃদুভাষী এবং কম কথা বলেন। মনে মনে ভাবলাম টালিগঞ্জ  অগ্রগামী  নব্বইয়ের   দশকের কোচ ঠিক এরকম ছিলেন, ওনার  সঙ্গেও আড্ডা মারা খুব শক্ত ছিল। চায়ে দুবার চুমুক  দিয়ে  জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি যে সুর বেঁধে দিলেন তাই দিয়েই শুরু করি? খুব কম লোক আপনার সম্বন্ধে  জানে,  আমি অনেক খুঁজেও খুব বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারি নি, মুল কারণটা কি?”

“সেরকম কিছু নয়, সাধারণ ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম, বাবা মার একমাত্র  সন্তান,  চেয়েছিলেন   বিদেশে গিয়ে ডাক্তারি পড়ি, কিংবা নিদেনপক্ষে ইঞ্জিনিয়ারিং বা ওকালতি। যখন কিছুই হল না ওনারা  নিজেদের  গুটিয়ে নিতে লাগলেন, আর ওনাদের সাথে সাথে আমিও।”

“স্যার, কিছু মনে করবেন না, এক বাক্যে আপনি কিন্তু একদম গল্পের সেন্টারে এনে  ফেললেন  আমাকে!একটু বিশদে জানতে চাই। আপনার বাবা মা চেয়েছিলেন আপনি অন্য কিছু পড়াশুনো  করুন, আপনি   গেলেন ইতিহাস-চর্চায়, এর পর বহু বছরের প্রচেষ্টা, গবেষণা, আর তার ফলস্বরূপ  ‘বাংলা – সিরাজের  আগে  ও পরে’ এই বই রচনা, আর সে বইয়ের পুরষ্কার প্রাপ্তি।”

ভদ্রলোক প্রাণ খুলে হেসে উঠলেন, পাক্কা দু মিনিট হেসে নিয়ে বললেন, “দারুণ দারুণ সারাংশ, আপনি  সফল ক্রিড়াসাংবাদিক এমনি এমনি হন নি। দারুণ ধরেছেন, তবে প্রচেষ্টার বদলে শব্দটা হবে সংগ্রাম,  জীবন  সংগ্রাম, যা আমার ক্ষেত্রে গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ঠেকেছিল।”

উনি বলে চললেন, “আমার বাবা তিন ভাইয়ের মধ্যে সব চেয়ে ছোট ছিল, আমাদের পৈত্রিক ভিটে কামারপুকুর। বাবা পোর্টট্রাস্টে কাজ পেয়ে কলকাতায় চলে আসেন, কিন্তু  ভিটের  মায়া  ত্যাগ  করতে  পারেন  নি। আর ভিটের লোকজনের ঈর্ষার জাল থেকেও কখনো বেরতে পারেন নি। বাবা  চাইতেন আমি সবার থেকে ভালো হই পড়াশুনোয়, সব বিষয়ে ফার্স্ট হতে হবে আমাকে! বিজ্ঞান, অঙ্ক আমার বা   হাতের খেলা বানিয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু ভবিতব্য অন্য কথা বলতে আরম্ভ করেছিল। যেদিন থেকে  স্কুলে  গৌরিশঙ্কর বাবুর কাছে প্রথম শুনেছিলাম সম্রাট অশোকের কথা, যেদিন  জেনেছিলাম  চাণক্যর  প্রখর  বুদ্ধির কথা, যেদিন অনুধাবন করেছিলাম সমুদ্র-গুপ্তের রাজকীয়তার বর্ণনা, সেদিন থেকে ইতিহাসের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। কি অদ্ভুত সে প্রেম ? একের পর এক চরিত্র যেন আমার ভাই, বোন, মা, বন্ধু হয়ে আমার সামনে দেখা দিয়েছে। ঝাঁসির রানী, বা বঙ্কিম-চন্দ্র কেউ আমার ভালবাসার বেষ্টনী থেকে বেড়িয়ে যেতে  পারে নি। সারাজীবন ভেবে গেছি এদের কথা, মাথা নিচু করে পড়াশুনো চালিয়ে গেছি, একটার পর একটা ফলক অতিক্রম করে গেছি, আর আজ সকালে আপনার কাছে দাঁড়িয়ে সেই সব দিনগুলোর স্মৃতিচারণ  করে  যাচ্ছি। কি? কেমন লাগল?”

“হুম, অপূর্ব। কতটা বাঁধা পেয়েছিলেন আপনার বিস্তৃত পরিবার থেকে?”

“অনেক, স্বল্প পরিসরে বলে উঠতে পারব না। সব থেকে সুন্দর বললেন মেজ কাকা – ওনার ছেলে  ডাক্তার, উনি বললেন আমার মাথাটা দেখানো উচিত। সেই শুনে আমার মা খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে  দিলেন। তখন আমি বি এ পার্ট ওয়ান দেব। গৌরিশঙ্কর-বাবুর কাছে ছুটলাম, জিজ্ঞেস করলাম, এই পড়াশুনোয় কি সত্যিই কোনই ভবিষ্যৎ নেই? উনি বললেন, ‘না থাকলে বিষয়টা রইল কেন?’ এই বলে উনি একটা কথা বললেন  যা আজও মনে আছে। উনি বললেন – ‘রাজা গ্রামে ঘোড়ার গাড়ি কিনে নিয়ে এলেন, সবাই  আনন্দ  করলো,  কেউ ভাবেনি গ্রামের রাস্তায় সে গাড়ি চলতে পারে। ভেজা মাটির ওপর দিয়ে সে গাড়ি যখন ছুটে গেল তা সবাই উপভোগ করল, কিন্তু সে গাড়ি মাটির উপর যে দাগ রেখে গেল তা কেউ মনে রাখল  না ।  অর্থাৎ, রাজার পরের প্রজন্ম জানতেও পারল না যে সেই পথের, সেই ছোট গ্রামের রাস্তার কত মাহাত্ব, আর সেই রাস্তা, সেই গ্রামের ইতিহাসকে আগলে রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটা প্রজন্ম গৌরব  করলো, আরেকটা  প্রজন্ম সেই গৌরবকে হেলায় ভুলে গেল। কেন হল এমন ? কেননা যেদিন গাড়ি চলেছিল, সেদিন অনেক সাক্ষীদের মধ্যে কেউ কেউ সে ঘটনা লিখে রেখে গিয়েছিল, কাগজে আর মগজে। কিন্তু সে লেখা কেউ আত্মস্থ  করার প্রয়োজনবোধ করেনি।”

এর পর আরও অনেক কথা হল, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সমগ্র পৃথিবীতে ইতিহাসের মর্যাদা নিয়ে অনেক আলোচনা হল। সূর্য-বাবুর জীবনের আরও অনেক বাধা বিপত্তির কথা নোট করলাম, কিন্তু বারে বারে ফিরে এলো সেই মুল কথাটা – ‘একজন ইতিহাসবিদ যা লিপিবদ্ধ তাকে আত্মস্থ করে।’

ওঠার আগে জিজ্ঞেস করলাম, “যদি আপনি কলেজ, বা পরে ইউনিভারসিটিতে চাকরি  না   পেতেন   তাহলে কি করতেন?”

“ইতিহাস-চর্চা, যদি তার জন্য ভিক্ষেও করতে হত, তা হলেও।”

“আরেকটা প্রশ্ন – বিয়ে করলেন না কেন?”

“ওই যে বললাম, অনেকজনকে নিজের করে ফেলেছিলাম, সবাই প্রাক্তনী ছিল। আমার বয়সী  কাউকে  সুখী করতে পারতাম না, তাই আর বিয়ের দিকে এগোলাম না।”

১৪, আমতলা রোডের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে সোজা চৌরঙ্গী গেলাম, দপ্তরে বড়সাহেবকে  দুটো  কাগজ পাঠিয়ে দিলাম – একটা চাকরি থেকে ত্যাগপত্র, আর একটা চিঠি যাতে স্পষ্ট ভাষায় লেখা কেন চাকরি ছাড়লাম। লিখলাম, “সারা জীবন ক্রিড়াজগৎ নিয়ে লিখব, দরকার পরে ভিক্ষা করেও লিখব ।।”
The Author Anwesh Mukherjee

Anwesh Mukherjee

Mr. Anwesh Mukherjee who is a software engineer by profession and is a Swedish National is also a story-writer, a poet and an essayist, who thrives on human values and human emotions, and who embodies in his works, elements from past and present generations of human society. A formidable grip on characters allows him to document complexity and openness with equal ease. The poetic charm gets mixed with a narrative flavor which creates a unique description of incidents in Anwesh’s works. A mind molded in the realm of simplicity of yester-years yearning to reach out to the audacious vivacity of the new age life is a simple depiction of Mr. Mukherjee as an author and a smooth and lucid blend of lyrical words with some commonplace expressions best describes the language the Anwesh the author cherishes the most.

 

 

Image Credit: Google Images